উপহারের ভাবনা
দেশি হাতে তৈরি উপহার: প্রতিটি উপলক্ষ ও বাজেটের গাইড
লিখেছেন JADUZ সম্পাদকীয়৭ মিনিটে পড়া
দেশি হাতে তৈরি ভালো উপহারের মধ্যে আছে নকশি কাঁথার চাদর ও কুশন কভার, জামদানি শাড়ি, শীতল পাটি, রং-করা শখের হাঁড়ি, কাঁসা-পিতলের তৈজস, পাটের ঝুড়ি আর রিকশাচিত্রের ট্রে। মানুষ আর উপলক্ষ বুঝে কারুশিল্প বাছুন, কারিগর আর জায়গার নাম দেখে নিন, আর কিনুন এমন কারও কাছ থেকে, যিনি বলতে পারেন জিনিসটি কীভাবে তৈরি।
দেশি হাতে তৈরি ভালো উপহার কোনটি?
ভালো উপহার সেটাই, যা মানুষটি ব্যবহার করবেন বা যত্ন করে রেখে দেবেন, যার কারিগরের নাম আপনি জানেন, আর যে কারুশিল্প উপলক্ষের সঙ্গে মানায়। বাংলাদেশে এমন কারুশিল্প অনেক, তার চারটি ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায়: জামদানি বয়ন (২০১৩), সিলেটের শীতলপাটি বয়ন (২০১৭), ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র (২০২৩), আর টাঙ্গাইল শাড়ি বয়ন (২০২৫)।
এই গাইডে বাছাই করা হয়েছে তিনভাবে: কারুশিল্প, উপলক্ষ আর বাজেট ধরে। নিচের দামগুলো তারিখসহ সংবাদ প্রতিবেদন থেকে নেওয়া, পত্রিকা আর সালের নাম উল্লেখ করে, কারণ হাতে তৈরি জিনিসের দাম বদলায়। আজকের চলতি দাম আর অর্ডার করার মতো পণ্য পাবেন JADUZ-এর উপহার খোঁজার পাতায়, যেখানে উপলক্ষ আর বাজেট ধরে সাজানো আছে।
দুটি প্রশ্নেই বেশির ভাগ বাছাই সহজ হয়ে যায়। মানুষটি জিনিসটি ব্যবহার করবেন, নাকি সাজিয়ে রাখবেন? আর নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে কি পৌঁছাতে হবে? কাঁথা প্রতি শীতে গায়ে ওঠে, শখের হাঁড়ি তাকে সাজানো থাকে। বিয়ের তারিখ ঠিক থাকে, ধন্যবাদের উপহারের থাকে না।
কোন কারুশিল্প উপহারে সবচেয়ে ভালো?
নিচের প্রতিটি কারুশিল্প আলাদা ধরনের মানুষের জন্য, আর লিংকগুলো আমাদের পূর্ণ গাইডে নিয়ে যাবে।
নকশি কাঁথা
কয়েক পরত কাপড় চলতি ফোঁড়ে সেলাই করা; বাংলাপিডিয়া বলছে, এই ফোঁড়েই কাঁথার গায়ে ঢেউ আর বুনট তৈরি হয়। সব বাজেটেই চলে: ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলো কারুপল্লীতে কাঁথার কুশন কভার পেয়েছে ৳৬০০-এর মধ্যে, আর কুমুদিনীতে পুরো কাঁথা ৳৮,১০০ থেকে ৳১৪,০০০-এ। দেখুন নকশিকাঁথার গাইড আর নকশি কাঁথার দামের গাইড।
জামদানি
ইউনেস্কোর বর্ণনায় জামদানি ঢাকার আশপাশে হাতে তাঁতে বোনা উজ্জ্বল নকশার মিহি সুতি কাপড়। যিনি শাড়ি পরেন, তাঁর জন্য জামদানি শাড়ি চিরকালের উপহার। কেনার আগে পড়ে নিন আসল জামদানি চেনার উপায়, আর দেখুন জামদানির গাইড।
শীতল পাটি
মুর্তা নামের সবুজ বেতের সরু বেতিতে বোনা পাটি। ইউনেস্কো বলছে, সারা বাংলাদেশে এটি বসার মাদুর, বিছানার চাদর আর জায়নামাজ হিসেবে ব্যবহার হয়; তাই নতুন সংসার বা ঈদের উপহার হিসেবে খুব মানানসই। দেখুন শীতলপাটির গাইড।
শখের হাঁড়ি ও মাটির জিনিস
বাংলাপিডিয়া বলছে, শখের হাঁড়ি রং-করা মাটির পাত্র, তাতে মাছ, পাখি আর পদ্মের নকশা, আর বিয়েতে ফল-মিষ্টি পাঠানো হয় এতে করে। দেখুন মৃৎশিল্প আর মৃৎশিল্প ও টেরাকোটা।
কাঁসা ও পিতল
কাঁসা বা বেল মেটালে মোটামুটি চার ভাগ তামার সঙ্গে এক ভাগ টিন; উইকিপিডিয়া বলছে, টিন বেশি হলে ধাতু শক্ত হয়, আওয়াজও হয় সুরেলা। তাই উঁচুমানের ঘণ্টা ঢালাইয়ে এই ধাতু ব্যবহার হয়, আর দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে রান্না ও খাওয়ার বাসনেও। দেখুন কাঁসা-পিতল।
পাট, বেত ও বাঁশ
বাংলাপিডিয়া বলছে, পাট হয়ে উঠেছে দেশের হস্তশিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল, আর বেত-বাঁশের কাজের ঐতিহ্যও বহু পুরোনো। ঝুড়ি আর রানার সহজ, কাজের উপহার; দেখুন ঝুড়ি ও বুনন।
রিকশাচিত্র
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২২ সালে লিখেছে, রিকশায় হাতে আঁকার জায়গা ডিজিটাল প্রিন্ট নিয়ে নেওয়ায় রিকশাচিত্রীরা এখন চায়ের কাপ, গয়নার বাক্স আর ট্রেতে ছবি আঁকেন। দেখুন রিকশাচিত্র আর দেয়ালচিত্র।
গয়না
হাতে গড়া গয়না এমন ছোট উপহার, যা পাঠানো বা ব্যাগে নেওয়া সহজ। চলতি পণ্য দেখুন গয়না বিভাগে।
কোন উপলক্ষে কোন উপহার?
বেশির ভাগ কারুশিল্প কয়েকটি উপলক্ষেই চলে, তবে কিছু জুটি সরাসরি ঐতিহ্য থেকে আসা।
- ঈদ। ঈদের রীতি সালামি, বড়রা ছোটদের হাতে যে টাকা দেন। যাঁদের সালামির বয়স পেরিয়েছে, তাঁদের জন্য হাতে তৈরি কিছু: শীতল পাটির জায়নামাজ, ঈদের টেবিলের জন্য কাঁসা, মা-বাবার জন্য একটি কাঁথা। বাজেট ধরে সাজানো আছে আমাদের ঈদের উপহার আইডিয়ায়।
- বিয়ে। শীত বিয়ের মৌসুম; ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখেছে, ডিসেম্বর-জানুয়ারি সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। কাঁথার বিছানার চাদর, কনের জন্য জামদানি, নতুন সংসারের তৈজস সবই মানায়, আর বাংলাপিডিয়া বলছে, বিয়েতে ফল-মিষ্টি পাঠানো হয় শখের হাঁড়িতে করে। দেখুন বিয়ের উপহার আইডিয়া।
- পহেলা বৈশাখ। রং-করা মাটির জিনিস বৈশাখী মেলার চেনা অনুষঙ্গ। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৫ সালের এপ্রিলে জানিয়েছে, বৈশাখী মেলার প্রস্তুতিতে রাজশাহীর শখের হাঁড়ির কারিগরদের ব্যস্ততা তুঙ্গে।
- পূজা। ডেইলি স্টার ২০২১ সালে লিখেছে, শোলা, অর্থাৎ এক ধরনের গাছের নরম সাদা মজ্জা, পূজা আর হিন্দু বিয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেখুন শোলাশিল্প।
- নতুন বাসা। মেঝে বা দেয়ালের জন্য কিছু: শীতল পাটি, কাঁথার দেয়ালসজ্জা বা রং-করা ট্রে।
- বিদেশে থাকা কারও জন্য। হালকা, সমতল আর না-ভাঙার মতো হওয়াটাই আসল। প্যাকিং আর কাস্টমসের কথা আছে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার উপহারের গাইডে।
কোন বাজেটে কী দেওয়া যায়?
নিচের প্রতিটি দাম তারিখসহ প্রতিবেদনের, JADUZ-এর দাম নয়। চলতি দামের পণ্য সরাসরি দেখুন ৳১,০০০-এর মধ্যে, ৳২,৫০০-এর মধ্যে আর ৳৫,০০০-এর মধ্যে।
৳১,০০০-এর মধ্যে
- কাঁথা-ফোঁড়ের পার্স ও টেবিল ম্যাট: কুমুদিনীতে ৳৩০০ থেকে ৳৩৫০, প্রথম আলো, জানুয়ারি ২০২৬।
- কাঁথার কুশন কভার: কারুপল্লীতে ৳৬০০-এর মধ্যে, একই প্রতিবেদন।
- শখের হাঁড়ি: ২০২৫ সালের বৈশাখী মেলার আগে রাজশাহীতে ৳২০ থেকে ৳১,০০০, ঢাকা ট্রিবিউন।
৳১,০০০ থেকে ৳৫,০০০
- কাঁথার ওয়ালম্যাট: কুমুদিনীতে ৳৭০০ থেকে ৳২,২০০ (প্রথম আলো, ২০২৬)।
- কাঁথার বিছানার চাদর: কারুপল্লীতে ৳৩,০০০ থেকে ৳৪,৪০০ (প্রথম আলো, ২০২৬)।
- ৪০ কাউন্টের মোটা সুতার জামদানি: ধানমন্ডি হকার্সে ৳২,৫০০ থেকে ৳৫,০০০ (প্রথম আলো, নভেম্বর ২০২৪)।
- কাঁথা-ফোঁড়ের শাড়ি: কুমুদিনীতে ৳৫,০০০ থেকে ৳৫,৫০০ (প্রথম আলো, ২০২৬)।
৳৫,০০০ ও তার বেশি
- পুরো নকশি কাঁথা: কুমুদিনীতে ৳৮,১০০ থেকে ৳১৪,০০০, মাধবী মার্টে ৳২০,০০০ পর্যন্ত (প্রথম আলো, ২০২৬)।
- ৮০ কাউন্টের জামদানি: ধানমন্ডি হকার্সে ৳৮,০০০ থেকে ৳১৭,০০০, আর মিহি হাফ সিল্ক ৳২০,০০০ থেকে ৳১,০০,০০০ (প্রথম আলো, ২০২৪)।
- কাঁসা: বিক্রি হয় ওজনে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২০ সালে জানিয়েছিল, ইসলামপুরে কাঁসা কেজিপ্রতি ৳৩,৫০০ থেকে ৳৫,৫০০; তাই দু-এক কেজি ওজনের একটি সেট এই স্তরে চলে আসে।
নাম লেখা বা অর্ডারে বানানো উপহার কি ভালো?
একটি নাম, একটি তারিখ বা ছোট একটি বার্তা ভালো উপহারকে এমন উপহার বানায়, যা দ্বিতীয়বার কেনা যায় না। JADUZ-এ অর্ডারে বানানো পণ্যে কারিগর সেলাই করে বা এঁকে নাম, তারিখ বা বার্তা লিখে দিতে পারেন। দেখুন নিজের মতো উপহার অথবা সব অর্ডারে বানানো পণ্য।
অর্ডারে বানানো মানে আপনি অর্ডার দেওয়ার পর কারিগর কাজ শুরু করেন, তাই সময় লাগে। JADUZ-এ অর্ডারে বানানো প্রতিটি পণ্যে তৈরির সময় লেখা থাকে, যা ডেলিভারির সময়ের সঙ্গে যোগ হয়। বিয়ে, ঈদ বা ফ্লাইটের তারিখ থাকলে পেছন থেকে হিসাব করুন: অনুষ্ঠানের তারিখ থেকে ডেলিভারি পাতার দিন বাদ দিন, তারপর পণ্যের তৈরির সময়। হাতে সময় কম থাকলে তৈরি পণ্য নিন, আর ব্যক্তিগত ছোঁয়াটা দিন একটি কার্ডে।
হাতে তৈরি জিনিস একটু একটু আলাদা হয়। একই নকশার দুটি কুশন কভার হুবহু এক হবে না, আর সেটাই এর সৌন্দর্য। JADUZ-এ কারিগরদের বলা হয় ছবিতে যেকোনো খুঁত বা তারতম্য সৎভাবে দেখাতে।
দেশের ভেতরে হাতে তৈরি উপহার কীভাবে পাঠাবেন?
JADUZ-এ প্রতিটি অর্ডার ক্যাশ অন ডেলিভারি, বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায়: পার্সেল পৌঁছালে কুরিয়ার টাকা নেন। উপহারের বেলায় এর একটা মানে আছে। অন্য কারও ঠিকানায় পাঠালে যিনি পার্সেল নেবেন, টাকা দেবেন তিনিই; তাই আগেই জানিয়ে দিন উপহার আসছে আর কত টাকা দিতে হবে। অন্য কারও হয়ে অনলাইনে আগাম টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই।
ঢাকা আর দেশের অন্য জায়গার ডেলিভারি চার্জ ও সাধারণ সময় আছে ডেলিভারি পাতায়, আর একটিই ডেলিভারি চার্জে কয়েকজন কারিগরের পণ্য আসে (ডেলিভারি)। কারিগর প্যাক করার আগে JADUZ ফোন করে প্রতিটি অর্ডার নিশ্চিত করে, আর প্রতিটি পণ্যে লেখা থাকে কে বানিয়েছেন, কোথায়, আর কবে পৌঁছানোর কথা।
ভঙ্গুর জিনিসেরও সুরক্ষা আছে। হাঁড়ি, কাঁসার বাটি বা অন্য কিছু ভাঙা, ভুল বা বর্ণনার সঙ্গে না মিললে দাবির সময়সীমার (রিটার্ন পাতা) মধ্যে ছবিসহ জানান; JADUZ বদলে দেবে বা টাকা ফেরত দেবে, বিস্তারিত রিটার্ন পাতায়। মন বদলালে ফেরত নেওয়া সম্ভব নয়, কারণ প্রতিটি পণ্য ছোট কারিগরের হাতে তৈরি।
উপহার যদি বিদেশে যায়?
JADUZ দেশের ভেতরে ডেলিভারি দেয়, তাই বিদেশের কারও উপহার যাবে আপনার স্যুটকেসে বা নিজের পাঠানো পার্সেলে। তাতে বাছাইয়ের হিসাব বদলায়।
কাপড়ই এগিয়ে। কাঁথার চাদর, কুশন কভার বা জামদানি সমান করে ভাঁজ হয়, ওজন কম, ভাঙে না। ধাতু মজবুত কিন্তু ভারী; কাঁসা কেজি দরে বিক্রি হয়, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২০ সালের এই তথ্যই মনে করিয়ে দেয়, ব্যাগের ওজনসীমায় এটি ভালোই জায়গা নেবে। মাটির জিনিস সুন্দর, কিন্তু ভঙ্গুর।
কাস্টমসও ভাবতে হবে। মার্কিন কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন বলছে, খড়ের হস্তশিল্পসহ প্রতিটি উদ্ভিদ বা উদ্ভিদজাত পণ্য ঘোষণা করতে হবে; উদ্ভিদের আঁশে বোনা পাটি আর ঝুড়িও এর আওতায়। যুক্তরাজ্যে GOV.UK বলছে, উদ্ভিদজাত পণ্যের নিয়ম নির্ভর করে পণ্য আর কোন দেশ থেকে আনা হচ্ছে তার ওপর। বিস্তারিত আছে আমাদের বিদেশে নিয়ে যাওয়ার উপহারের গাইডে।
কারিগর ন্যায্য টাকা পাচ্ছেন কি না, কীভাবে বুঝবেন?
বিক্রেতা না বললে সাধারণত বোঝার উপায় নেই। সবচেয়ে পরিচিত দুটি কারুশিল্পের প্রতিবেদন দেখায়, প্রশ্নটা কেন জরুরি। বাসস ২০১৯ সালে জানিয়েছিল, রাজশাহীর এক উদ্যোক্তার হয়ে নকশি কাঁথা সেলাই করা নারীরা প্রতিটির জন্য পান ৳১,৬০০ থেকে ৳১,৭০০। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৩ সালে লিখেছে, একটি জামদানি শাড়ির দাম ৳১০,০০০ হলে কারখানার মালিক পান অর্ধেক, বাকিটা ভাগ করে নেন কারিগর আর শাগরেদেরা।
কারিগরের নাম আর জায়গা জানানোই সবচেয়ে সহজ লক্ষণ যে বিক্রেতা জানেন টাকা কোথায় যায়। JADUZ-এ প্রতিটি পণ্যে কারিগর আর জেলার নাম থাকে। বিক্রি শুরুর আগে কিউরেটর কারিগরের কাজের নমুনা, নিজ হাতে তৈরির প্রমাণ আর পরিচয় যাচাই করেন। JADUZ কারিগরের প্রচার করে, কুরিয়ারের মাধ্যমে টাকা তোলে, কমিশন রেখে বাকিটা কারিগরকে দেয়। আরও জানুন JADUZ কীভাবে কাজ করে, পরিচিত হোন কারিগরদের সঙ্গে, অথবা শুরু করুন উপহার খোঁজার পাতা থেকে।